স্বাধীনতা—শব্দটা শুনলেই আমাদের বুক ভরে যায় গর্বে।
লাল-সবুজ পতাকা, শহীদের আত্মত্যাগ, একটি জাতির রক্তে লেখা ইতিহাস—সবকিছু একসাথে মনে পড়ে।
কিন্তু এখানেই থামা যায় না।
কারণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা এখনো অনুচ্চারিত—
স্বাধীনতা মানেই কি আমরা নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারি?
নাকি আমরা শুধু স্বাধীন বলে ভাবতে শিখেছি?
সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ভারতের বিজয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একটি বক্তব্য—কিন্তু তার প্রভাব গভীর। কারণ রাষ্ট্রীয় বক্তব্য কখনো নিরীহ হয় না। ভাষাই ভবিষ্যতের বাস্তবতা তৈরি করে।
তাহলে বাংলাদেশের লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ কোথায় দাঁড়ায়?
অগণিত মায়ের চোখের জল, ত্যাগ, সংগ্রাম—এসব কি কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে?
অনেকে একে কূটনৈতিক ভাষা বলে এড়িয়ে যেতে চান। কিন্তু ইতিহাস আমাদের অন্য কথা বলে। ইতিহাস দেখিয়েছে—বড় পরিবর্তন শুরু হয় ছোট বয়ান দিয়ে। আগে বলা হয় “সহযোগিতা”, তারপর “নেতৃত্ব”, একসময় সেটাই হয়ে ওঠে “অধিকার”।
এই গল্প নতুন নয়। হায়দরাবাদও একদিন স্বাধীনতার আশ্বাস পেয়েছিল।
কিন্তু ধীরে ধীরে সেই আশ্বাস রূপ নিয়েছিল চুক্তিতে, চাপে এবং শেষ পর্যন্ত নিঃশব্দ আত্মসমর্পণে। কোনো হইচই হয়নি, কোনো নাটক হয়নি—সবকিছু ঘটেছিল খুব স্বাভাবিকভাবে।
আজ তাই প্রশ্ন উঠছে—আমরাও কি সেই একই পথে হাঁটছি?
৩৬ জুলাইয়ের পর বিপ্লবী সরকার না থাকায় যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কি কেবল ক্ষমতার হিসাব? নাকি এই শূন্যতা আমাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকেও দুর্বল করে দিচ্ছে?
আজ বন্দর, অবকাঠামো ও কৌশলগত সম্পদ নিয়ে যে আলোচনা শোনা যায়—বিদেশীদের হাতে তুলে দেওয়ার যে গুঞ্জন বাতাসে ভাসে—সেগুলো কি সত্যিই গুজব? নাকি এটাও সেই পুরনো কৌশল—আগে অস্বীকার, পরে চুক্তি, আর শেষে নীরব আত্মসমর্পণ?
এই লেখা কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। এটা রাজনীতির চেয়েও বড় প্রশ্ন—এটা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
সব প্রশ্নের উত্তর এখনই পাওয়া যাবে না। কিন্তু ইতিহাস একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—প্রশ্ন না তুললেই সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়।
সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা যখন আপেক্ষিক:
প্রশ্ন তোলা মানেই নেতিবাচকতা নয়; প্রশ্ন তোলা মানে নিজের অস্তিত্বকে জানান দেওয়া। আমরা যখন 'সার্বভৌমত্ব' শব্দটা উচ্চারণ করি, তখন কি আমরা স্রেফ একটি ভৌগোলিক সীমারেখার কথা ভাবি? নাকি সেই সীমারেখার ভেতরকার মানুষের শিরদাঁড়া সোজা রাখার শক্তির কথা ভাবি?
ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাস হলো, দখলদারিত্ব এখন আর সবসময় ট্যাংক বা সৈন্য পাঠিয়ে হয় না। আধুনিক যুগে পরাধীনতা আসে অর্থনৈতিক করিডোর, কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদী ঋণের মোড়কে। যখন কোনো রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণী টেবিলের সিদ্ধান্তগুলো দেশের মানুষের চাহিদার চেয়ে বিদেশের ইশারায় বেশি প্রভাবিত হয়, তখন বুঝতে হবে স্বাধীনতার মানচিত্রটা স্রেফ দেয়ালে টাঙানোর জন্যই রয়ে গেছে।
ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান:
সিকিমের কথা ভাবুন। ১৯৭৫ সালের আগে সেটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল। কিন্তু সেই স্বাধীনতা কি একদিনে হারিয়েছিল? না। প্রথমে এলো নিরাপত্তা চুক্তি, তারপর প্রশাসনিক 'সহযোগিতা', আর সবশেষে গণভোটের নামে এক চূড়ান্ত বিলীনকরণ।
আমরা কি খেয়াল করছি যে, আমাদের অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে ছোট রাষ্ট্রগুলোর স্পেস বা জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে?
পণ্য চলাচলের সুবিধা নাকি সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি? ট্রানজিট বা কানেক্টিভিটি উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেই কানেক্টিভিটি যখন একতরফা হয়ে দাঁড়ায় এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে ওঠে, তখন তাকে কি উন্নয়ন বলা চলে?
শূন্যতার সুযোগ: একটি রাষ্ট্র যখন রাজনৈতিকভাবে অস্থির থাকে, তখন শকুনের দৃষ্টি পড়ে তার সম্পদের ওপর। ৩৬ জুলাই-পরবর্তী এই সময়ে আমরা কি নিজেদের ঘর গোছাচ্ছি, নাকি বাইরের শক্তির জন্য দরজা খুলে দিচ্ছি?
নীরবতার মূল্য অনেক চড়া:
অনেকে বলেন, "আমরা তো ছোট দেশ, আমাদের মানিয়ে নিতে হবে।" কিন্তু মানিয়ে নেওয়া আর মেরুদণ্ড বিক্রি করে দেওয়া এক কথা নয়। ভিয়েতনাম ছোট দেশ ছিল, আফগানিস্তান প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে ছিল—কিন্তু তারা নিজেদের মাটির অধিকার ছাড়েনি।
আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ আজ আতঙ্কিত। কারণ তারা দেখছে, নীতিনির্ধারকদের বয়ানে আগের চেয়েও বেশি জড়তা। যখন দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর বা কৌশলগত স্থাপনা নিয়ে ভিনদেশি প্রভাবের কথা ওঠে, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব স্পষ্ট জবাব দেওয়া। কিন্তু রহস্যময় নীরবতা বা অস্পষ্ট ব্যাখ্যা সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করে।
উপসংহার নয়, বরং একটি নতুন শুরু:
স্বাধীনতা কোনো অর্জিত মেডেল নয় যে একবার পেয়ে গেলে সারাজীবনের জন্য আলমারিতে তুলে রাখা যাবে। স্বাধীনতা হলো একটি প্রতিদিনের লড়াই। প্রতিদিন একে রক্ষা করতে হয়।
আমরা যদি আজ নরেন্দ্র মোদির বক্তব্য কিংবা আমাদের বন্দর নিয়ে হতে যাওয়া চুক্তির নেপথ্য কাহিনী নিয়ে প্রশ্ন না তুলি, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। কারণ আজকের নীরবতা আগামী প্রজন্মের কাছে 'দাসত্বের দলিল' হিসেবে গণ্য হতে পারে।
আমরা কি সত্যিই স্বাধীন? উত্তরটা আমাদের কাজের ওপর নির্ভর করছে, কেবল ইতিহাসের বইয়ের ওপর নয়।
ইতিহাসের আয়নায় সবকিছু কে পুনঃনিরীক্ষণ করতে হলে পড়তে পারেন "পরাধীন স্বাধীনতা।"