Whatsapp: +8801567808596

  |  

Track Order

Blog post main image

পরাধীন স্বাধীনতা: ইতিহাসের পাঠ

ইতিহাস কেবল অতীতে ঘটে যাওয়া কিছু কাহিনীর সংকলন নয়; ইতিহাস হলো ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা। যখন একটি জাতি নিজের ভুলগুলো থেকে শেখে না, তখন ইতিহাস ভিন্ন নাম ও ভিন্ন পটভূমিতে নিজেকে বারবার ফিরে আনে। ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভাজনের পর হায়দারাবাদের পতন এবং ২০২৪ সালের ২৪ শে জুলাই (৩৬ জুলাই) গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর অর্জিত ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’—এই দুই প্রেক্ষাপটকে পাশাপাশি রাখলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: আমরা কি আমাদের এই রক্তে অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারব?

একটি রাষ্ট্র কীভাবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ভুল নীতি এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ফাঁদে পড়ে স্বাধীন সত্তা হারায়, তা বুঝতে হলে হায়দারাবাদের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস এবং বাংলাদেশ ভূখণ্ডের বর্তমান বাস্তবতার দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

১. হায়দারাবাদের পতন: ভুল হিসাব ও অভ্যন্তরীণ সংকট

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর উপমহাদেশে প্রায় ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্য (Princely States) বা প্রদেয় অঞ্চল ছিল। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে এসবের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও সমৃদ্ধ রাজ্য ছিল হায়দারাবাদ।

শাসক ও মনস্তত্ত্ব: হায়দারাবাদের শেষ নিজাম মীর উসমান আলী খান ভারতকে এড়িয়ে নিজ রাজ্যের স্বাধীন সত্তা বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মূল সমস্যা ছিল ভূ-রাজনীতি না বোঝা। চারদিকে ভারত বেষ্টিত একটি ভূখণ্ড কীভাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বা সামরিক নিরাপত্তা ছাড়া টিকে থাকবে, তার কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান তাঁর কাছে ছিল না।
স্ট্যান্ডস্টিল এগ্রিমেন্ট (১৯৪৭): ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর নিজাম ভারতের সঙ্গে এক বছরের জন্য "Standstill Agreement" বা অচলবস্থা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা বজায় রেখে ধীরগতিতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া।
অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও ‘রজাকার’ বাহিনী: আলোচনার আড়ালে রাজ্যের ভেতরের রাজনৈতিক বিভাজন চরম আকার ধারণ করে। কাসিম রিজভির নেতৃত্বে ‘রজাকার’ নামে পরিচিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী গঠিত হয়, যা চরমপন্থী অবস্থান নিয়ে রাজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এর ফলে সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয় এবং বহিঃশক্তির সামরিক পদক্ষেপের পথ পরিষ্কার হয়ে যায়।
‘অপারেশন পোলো’ (১৯৪৮): রাজনৈতিক ও সামরিক সুযোগ বুঝে ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী হায়দারাবাদে অভিযান শুরু করে, যার কোড নাম ছিল "Operation Polo"। মাত্র ৫ দিনের ব্যবধানে, ১৭ সেপ্টেম্বর নিজাম যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন এবং ১৮ সেপ্টেম্বর মেজর জেনারেল সৈয়দ আহমেদ এল-এদরুস আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন।
সহিংসতার দলিল: যুদ্ধের পর রাজ্যের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ভারত সরকার পণ্ডিত সুন্দরলালের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ‘সুন্দরলাল কমিটির প্রতিবেদন’ অনুসারে, অভিযান-পরবর্তী সহিংসতায় প্রায় ২৭,০০০ থেকে ৪০,০০০ (কারো মতে তারও বেশি) মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
একটি স্বাধীন ভূখণ্ড কীভাবে অভ্যন্তরীণ অযোগ্যতা, রাজনৈতিক বিভাজন ও দুর্বল কূটনীতির কারণে ধূলিসাৎ হতে পারে, হায়দারাবাদ তার নিখুঁত উদাহরণ।

২. ২৪ শে জুলাইয়ের বিপ্লব ও বাংলাদেশের ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’:

ইতিহাসের সেই শিক্ষাকে যদি আজ আমরা বাংলাদেশের জায়গায় দাঁড় করাই, তবে চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালে ছাত্রদের হাত ধরে শুরু হওয়া আন্দোলন ২৪ শে জুলাই (৩৬ জুলাই) একটি অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটে।

এই অভ্যুত্থান আমাদের একটি ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ এনে দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই স্বাধীনতা কি আমরা ধরে রাখতে পারব?

হায়দারাবাদের ট্র্যাজেডি আর বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ক্ষমতা পরিবর্তন হলেই স্বাধীনতা সুরক্ষিত হয় না। ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে যে কোনো অর্জনই ক্ষণস্থায়ী হতে পারে।

৩. ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ রক্ষায় ইতিহাসের ৫টি মৌলিক শিক্ষা:

২৪ শে জুলাইয়ের পর গঠিত নতুন বাংলাদেশের জন্য হায়দারাবাদ ট্র্যাজেডি থেকে শেখার প্রধান ৫টি দিক নিচে তুলে ধরা হলো:

১. প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও ক্ষমতার ভারসাম্য
হায়দারাবাদের নিজাম শাসনব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন; সিদ্ধান্ত হতো একচ্ছত্র ইচ্ছার ওপর। বাংলাদেশে স্বৈরাচারের পতনের পর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ এবং নির্বাচন ব্যবস্থার মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যক্তি বা দলীয় প্রভাবমুক্ত করে নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিষ্ঠান ভঙ্গুর হলে রাষ্ট্র সহজেই ভেঙে পড়ে।
২. ভূ-রাজনৈতিক সচেতনতা ও ভারসাম্যমূলক কূটনীতি
হায়দারাবাদের চারদিকে ছিল ভারত, কিন্তু নিজাম প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কৌশল এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর অবস্থান অনুধাবনে ব্যর্থ হন। বাংলাদেশও বঙ্গোপসাগর, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অত্যন্ত সংবেদনশীল ভৌগোলিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে। কোনো নির্দিষ্ট আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক শক্তির ওপর অন্ধ নির্ভরতা না রেখে, জাতীয় স্বার্থকে সবার ওপরে রেখে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা আমাদের টিকে থাকার প্রধান শর্ত।
৩. অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্য
হায়দারাবাদের অভ্যুদয় রোধে বড় অস্ত্র ছিল দেশটির ভেতরের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন। ২৪ শে জুলাইয়ের পর প্রাপ্ত দ্বিতীয় স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে রাজনৈতিক দল, ধর্ম ও শ্রেণি নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও উগ্রতা সবসময় বাইরের শক্তিকে হস্তক্ষেপ করার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দেয়।
৪. আয়নাঘর সংস্কৃতি ও তথ্যের স্বাধীনতা
একটি রাষ্ট্র তখনই ভেতর থেকে পচে যায়, যখন গুম, খুন, নির্যাতন এবং ভয়ের শাসন জারি রেখে সত্যকে ঢাকা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা অন্যায় ও তথ্য গোপনের সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে দুর্বল করে তোলে। ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ ধরে রাখতে হলে ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করে মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা আবশ্যক।
৫. অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা
সামরিক শক্তি বা ঘোষণার চেয়েও বড় শক্তি হলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। নিজামের রাজকোষে প্রাচুর্য থাকলেও অর্থনৈতিক নীতি ও দূরদর্শিতার অভাবে তা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে অর্থনৈতিক জালিয়াতি বন্ধ করে স্বাবলম্বী অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে।

শেষ কথা:

ইতিহাস আমাদের শেখায়—স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা অনেক বেশি কঠিন। ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হায়দারাবাদ তার মানচিত্র হারিয়েছিল কেবল সামরিক শক্তির কাছে নয়, বরং নিজস্ব রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবে এবং অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগে।

২৪ শে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ যে মুক্তির নতুন পথ খুঁজে পেয়েছে, তা রক্ষা করতে হলে ইতিহাসকে গভীরভাবে পড়তে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, রক্ত দিয়ে কেনা এই ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ কেবল তখনই চিরস্থায়ী হবে, যখন আমরা অভ্যন্তরীণ বিভাজন ভুলে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলব এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় চোখ কান খোলা রেখে সিদ্ধান্ত নেব। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে সেই ইতিহাস আবার আমাদের সামনে এসে দাঁড়াবে—যা কোনো স্বাধীন জাতির জন্যই কাম্য নয়।